প্রসেসিং হচ্ছে, দয়া করে অপেক্ষা করুন...
প্রকৃতি ও অতিবৃষ্টির কবলে খুলনার বোরো চাষিদের স্বপ্নভঙ্গ: ক্ষতিগ্রস্ত ৮৭৩ হেক্টর জমির ফসল
প্রকাশঃ
0
জন এই প্রতিবেদনটি পড়েছেন
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা
খুলনা জেলায় বোরো ধান ঘরে তোলার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অতিবৃষ্টি কৃষকদের জীবনে চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এপ্রিল মাস থেকে শুরু করে মে মাসের প্রথমার্ধ পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে জেলার বোরো ধান ও শীতকালীন শাক-সবজির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই পর্যন্ত জেলার প্রায় ৮৭৩ হেক্টর জমির ধান ও সবজি ক্ষেত বৃষ্টির পানিতে সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে।
বিশেষ করে দাকোপ, রূপসা, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়া উপজেলার কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। কৃষকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এবারের মৌসুমে বীজ, সার, কীটনাশক এবং শ্রমিকের মজুরি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ আগেই অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল। মৌসুমের শুরুতে বীজতলা তৈরি ও রোপণের সময় থেকে শুরু করে কাটার আগ পর্যন্ত দফায় দফায় সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। ধান কাটার সময় একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা থাকলেও রূপসা, ডুমুরিয়া ও তেরখাদা এলাকায় তা বেড়ে ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে একজন শ্রমিককে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের এপ্রিলে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা গত নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। এপ্রিল মাসে জেলায় গড়ে ৩৩ দশমিক ৭০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করার পাশাপাশি মে মাসের প্রথম সপ্তাহ জুড়েও বৃষ্টির এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে ১ মে ১৯ মিলিমিটার এবং পরবর্তী কয়েক দিনেও কয়েক মিলিমিটার করে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এবারের বোরো মৌসুমে জেলায় ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে ৬৫ হাজার ৭৭৮ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে ডুমুরিয়া ও পাইকগাছা উপজেলায় আবাদের হার ছিল সবচেয়ে বেশি।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সুবীর কুমার বিশ্বাস জানান যে, হেক্টরপ্রতি গড়ে ৪ দশমিক ৭৪ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষকরা হীরা-১, হীরা-২, হীরা-১৯, সুবর্ণ-৩, ছক্কা ও সিনজেনটা-১২০৩ জাতের বিভিন্ন উচ্চফলনশীল হাইব্রিড বীজ ব্যবহার করেছিলেন। তবে মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে হঠাত সারের সংকট পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তোলে। এপ্রিলের শেষ ও মে মাসের শুরুতে অতিবৃষ্টির কারণে শুধু বোরো ধান নয়, বরং গ্রীষ্মকালীন সবজি, তরমুজ, ভুট্টা, মুগ ও তিলের ক্ষেতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে মে মাসের শুরুতে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেতের ধান কাটার আগেই শীষ থেকে ঝরে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে।
অঞ্চলভেদে ক্ষয়ক্ষতির চিত্রে দেখা যায় যে ডুমুরিয়া উপজেলার শিংয়ের বিল, সাহাপুর ও মধুগ্রাম এবং রূপসা উপজেলার বিল জাবুসা এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। দাকোপ, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়ায় প্রায় ৭৭০ হেক্টর জমির বোরো ক্ষেত এখনো পানির নিচে। রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামের কৃষক মো. খোরশেদ আলম, মো. ওমর আলী শেখ ও আলেমান শেখ তাদের কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন যে অতি বৃষ্টির কারণে বিল জাবুসা এলাকায় তাদের বোরো ধানক্ষেত পুরোপুরি তলিয়ে গেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ধান কেটে ঘরে তোলার সুযোগটুকুও তারা পাননি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই বিশাল ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি সরকারি সহায়তা অপরিহার্য, অন্যথায় প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক কৃষক বড় ধরণের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত হবেন।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন